পৃথিবী তখনও কেবল এক নিঃসঙ্গ গ্রহ। প্রকৃতি তার আপন সৌন্দর্যে বিকশিত হলেও সেই সৌন্দর্যকে রক্ষা কিংবা কাজে লাগানোর মতো কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী তখনও জন্মায়নি। পৃথিবীর নিকটতম সৌরমণ্ডল, যা আজকের যুগে “আলফা সেন্টরি” নামে পরিচিত, সেখানকার এক প্রাচীন ও উন্নত গ্রহ ছিল ভার্নাস।

এই ভার্নাস গ্রহে বাস করত এক বিশেষ জাতি—ড্রোজার্ড ড্রাগনরা। তারা প্রধানত নীল বর্না, পিঠে চামড়ার পর্দা যুক্ত বিশালকার ডানা ও মাথায় দুটো শিং বিশিষ্ট হয়। এই ড্রোহার্ড ড্রাগন জাতিকে শাসন করতেন রাজা ড্রোজার্ড-শিও এবং রানি ড্রোজার্ড-নিয়া।
কিন্তু ষড়যন্ত্রের ফলে শিওর নিজের ভাই ড্রোজার্ড-জার্ক তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলে—শিও-ই নাকি তার মায়ের হত্যাকারী। এই অজুহাতেই জার্ক সিংহাসন দখল করে শিও ও নিয়াকে গ্রহ থেকে বিতাড়িত করে। সে তাদের এক ভয়ংকর পোর্টালের ভেতর ঠেলে দেয়।
শিও জানত, এই পোর্টাল মূলত অসৎ ড্রাগনদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। তখন ভার্নাস ছিল সেই সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে উন্নত গ্রহ। অথচ ভার্নাসের ইতিহাসে কোনো ড্রাগনকে জন্মগতভাবে অসৎ বলা যায় না। কারণ বহু যুগ আগে শিওর প্র – পিতামহ ড্রোজার্ড-জেনো সমগ্র ড্রাগন জাতিকে এমনভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেখানে অহংকার, ক্রোধ বা প্রতিশোধের কোনো স্থান ছিল না।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় শিওর পিতা ড্রোজার্ড-রিকোকে ঘিরে। রিকো নিজের এক আলাদা দল গঠন করে, আর সেই দলের মধ্য দিয়ে ক্রোধ ও হিংসার বিষ ছড়িয়ে পড়ে গোটা জাতিতে। এর ফলেই জন্ম নেয় ক্ষমতা দখলের বাসনা। সেই সময় জেনোই ছিলেন ভার্নাসের একমাত্র রাজা এবং তিনি ড্রাগনদের নির্দেশ দেন খুব তাড়াতাড়ি এক ভয়ংকর পোর্টাল নির্মাণের জন্য—যেখানে প্রবেশ করলে আর ফেরা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তৈরি হলো তার নির্দেশানুযায়ী এক আশ্চর্য পোর্টাল, কখনো তা খুলে যেত অন্য কোনো গ্রহে, কখনো দূর গ্যালাক্সিতে, আবার কখনো অসীম শূন্যতার ভেতরে।
জেনো দয়ালু প্রকৃতির ছিলেন, তিনি এই মরণফাঁদ বানাতে বাধ্য হয়েছিলেন ভার্নাস এর ভালো চেয়ে। বরং তাকে এরুপ কঠোর হতে বাধ্য করেছিল তার ছেলে রিকো। তবু তিনি চেয়েছিলেন, অপরাধী ড্রাগনদের অন্তত একবার নিজের প্রাণ রক্ষার সুযোগ দেওয়া হোক। এজন্য তিনি তৈরি করেন এক আশ্চর্য বেল্ট, যার কেন্দ্রে বসানো ছিল এক অলৌকিক পাথর—ভায়ওনা স্টার। এই পাথর জীবনের আয়ুকে দশগুণ বাড়িয়ে দিত, ফলে অপরাধীরও সুযোগ থাকত বেঁচে থেকে জীবনকে অচেনা পরিবেশে পুনরায় মানিয়ে নেওয়ার।
ভায়ওনা স্টারের ইতিহাসও বেশ বিস্ময়কর। এই গ্রহ ছিল সম্পূর্ণ কালো বর্ণের এবং এই গ্রহ ছিল সম্পূর্ণ চকচকে কাছের মতো অভ্যন্তরীণ ভাগ এবং বাইরের ভাগ এতটাই কালো বর্ণের যে সেই গ্রহ কোনো আলোড়নকে আড়াল না করলে অন্তরীক্ষে তার উপস্থিতি বোঝা যেতো না। বহু যুগ আগে এই ক্ষুদ্র গ্রহ খানির কিছুটা ভাগ ভগবানদের যুদ্ধে ভেঙে আলাদা হয়ে যায়। বহুযুগ পর জেনোর শাসনকাল তার সেই খণ্ড খানি মহাকাশে ঘুরতে ঘুরতে শেষমেষ এসে পড়ে ভার্নাসে, আর পতনের সাথে সাথে সেই গ্রহক্ষণ্ডের ছোট্ট ভাগটি ছোটো ছোটো টুকরো পাথরের আকারে ছড়িয়ে পড়ে ভার্নাসের মাটিতে। বলা হয়, সেই গ্রহ জীবন্ত—তার নিজস্ব প্রাণ ও ধর্ম আছে, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন। সেই উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পারত কেবল এমন কেউ যে সেই ব্রহ্মাণ্ডের ভগবানের অবতার বা অংশ হিসাবে জন্ম নিয়েছে। সুতরাং জেনোই ছিল সেই একজন, তাই তিনি ভায়ওনা স্টারকে নতুন ধর্মে দীক্ষিত করেন।
অতঃপর,ড্রোজার্ড- রিকো এবং ড্রোজার্ড-গ্রোনার দুই পুত্র সন্তান জন্ম নেয়—শিও ও জার্ক। জার্ক বড় ছেলে হলেও, শিও ছিল সবার প্রিয়। যখন জেনো জানতে পারলেন, রিকো এমনকি নিজের বাবাকেও অর্থাৎ তাকে হত্যা করার মতো মানসিকতা রাখে, তখন থেকেই তিনি তার প্রতি সতর্ক হন। একদিন রিকোর অনুসারীরা কিছু নিরীহ ড্রাগন পরিবারকে নির্যাতন করে, আর তা দেখতে পেয়ে তখনই দুই দলের মধ্যে বিশাল লড়াই হয় এবং রিকোর ড্রাগোন দের পরাজিত করে জেনোর ড্রাগনরা তাদের ধরে আনে বিচারের জন্য। বিচার বসে, শেষমেষ জানা যায় যে তারা তাদের পরিবারকে রিকোর ড্রাগনরা জোরজবরদস্তি করেছে রিকোর দল যোগ করার জন্য। অর্থাৎ তারা বেআইনি ভাবে গোপনে এই ধরনের কাজ করার ফলস্বরূপ, শাস্তি হিসেবে তাদের পোর্টালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সংবাদে রিকো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সে নিজের বাবার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ ভয়ংকর রূপ নেয়—অসংখ্য, যোদ্ধা ড্রাগনদের মৃত্যু হয়, ধ্বংসস্তূপে ভরে যায় ভার্নাস। আর শেষে নিহত হন জেনো ও রিকো দুজনেই।
রিকোকে সমর্থন করার কারণে জার্ককে কেউ আর পরবর্তী রাজা বলে মানতে চায়নি, যদিও জার্ক-এর তখনও রাজা হওয়ার পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্য ছিল না। তাই তখন গ্রোনা একাই সিংহাসনে বসেন, ভার্নাসের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ছোট শিওকে তিনি সযত্নে বড় করতে থাকেন। শিওর শৈশবের সঙ্গিনী নিয়াকেও নিজের কন্যার মতো করে লালন-পালন করেন। নিয়া ছিল জেনোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গীর সন্তান। যুদ্ধে তার মা-বাবা নিহত হলে গ্রোনা তাকে আশ্রয় দেন। ফলে শিও ও নিয়া একইসাথে বেড়ে ওঠে—বন্ধুত্ব ও সহযাত্রার বন্ধনে।
গ্রোনা শুধু শিও নয়, নিয়া-কেও প্রশিক্ষণ দেন—কৃষি, প্রযুক্তি, যুদ্ধ, চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রে। বিশেষত নিয়া চিকিৎসাশাস্ত্রে হয়ে ওঠে অতুলনীয়।
অন্যদিকে, জার্ককে বন্দি করে রাখা হয় গ্রোনার কারাগারে, কারণ সে তার বাবা অর্থাৎ রিকোর যুদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তে চরম ভাবে রাজি ছিল। গ্রোনা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে সেই অপরিণত বয়সেই গ্রোনা কে বুঝিয়ে দেয় যে সে ভবিষ্যতেও নিজের বাবার পথকে অবলম্বন করবে। তাতে দরকার পড়লে গ্রোনার প্রাণ নিতেও সে পিছপা হবে না।
গ্রোনা তাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু তার ভেতরের হিংস্র মানসিকতা তাকে থামিয়ে রেখেছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল—যতদিন গ্রোনা রানি থাকবেন, ততদিন জার্ক বন্দি থাকবে।
জার্ক এর মতো খারাপ এবং ক্ষতিকর একজন ড্রাগন বন্দী রয়েছে, আর বাইরে এত মনোরম পরিবেশ যেখানে কোনো হিংসা ও বিদ্বেষ নেই। মনে হচ্ছিল, যেন জেনোর শাসন কালের সেই শান্তিময় দিন গুলো আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু হঠাৎ একদিন রহস্যজনকভাবে মারা যান গ্রোনা। কিভাবে বা কেন, কেউই জানতে পারেনি। সেই সংবাদ প্রথম শিও ও নিয়া নিয়ে আসে।
গ্রোনার মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিল কেবল শিও। তাই সে রাজা হয়, আর নিয়া হয় তার রানি। কিন্তু গ্রোনার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তি পায় জার্ক। বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এসে সে আবার শুরু করে পুরোনো ষড়যন্ত্র। তার মায়ের মৃত্যুই যেন তার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে, সে এই সুযোগে সবার কান ভরে — শিও নাকি রাজা হওয়ার লোভে নিজের মাকেই হত্যা করেছে। গ্রোনার মৃত্যু আর সাধারণ মৃত্যু থাকে না, রহস্যে পরিণত হয় আর জার্কের এই সময়ে এই ছল সবার সেই রহস্য উদ্ঘাটনের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। তাই সন্দেহ করার জায়গাতে খুব সহজেই শিও কে দোষারোপ করতে থাকে। আশ্চর্যভাবে বহু ড্রাগন সিও এবং নিয়াকে শাস্তি দেয়ার আবেদন জানায়।
শান্তিপ্রিয় শিও শেষ পর্যন্ত সবার ইচ্ছাকে সম্মান জানায়। শাস্তি হিসেবে সে মেনে নেয়—নিজে ও নিয়াকে পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।
পোর্টালে প্রবেশের আগে নিয়ম মতো শিও ও নিয়া সঙ্গে নিল ভায়ওনা স্টারের বেল্ট এবং বিশেষ জীবনীশক্তিসম্পন্ন এক জল। এই জল ছিল এক পবিত্র নদী “প্লিনি” এর জল। এই নদীর ও এক বিশেষত্ব আছে, এই নদীর সন্ধান শুধু একমাত্র রাজার কাছেই থাকতো। তাই ভার্নাস এর রাজা নিজের আয়ু বাড়ানোর জন্য এই জলের ব্যবহার করতো আর সেই রাজা দয়ালু হলে বাকি ড্রাগনদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেত, নাহলে নয়। সেই দয়ালু রাজার উদাহরণ হিসাবে জেনো কে ধরা যেতে পারে। কিন্তু সেই নদীর সন্ধান কোনো সাধারণ ড্রাগন রা পেতো না। এদিকে জার্কের অনুগত কেউ গোপনে সেই জল ভরা পাত্রে বিষ মিশিয়ে দিল।
পোর্টাল খোলার সঙ্গে সঙ্গে তারা শূন্যে ভেসে ওঠে। তখনই টের পায়—তাদের বয়স যেন তিনগুণ বেড়ে গেছে। হঠাৎ নিয়ার চোখে পড়ে এক নীলাভ গ্রহ, বিস্ময়ে ভরে ওঠে তার দৃষ্টি। সে শিওকে তাকাতে বলে সেই গ্রহের দিকে (পৃথিবী)।
শিও বুঝতে পারে, আপাতত বাঁচার একমাত্র পথ এই অচেনা গ্রহ। তাই নিয়া-কে সঙ্গে নিয়ে সে নেমে আসে এই গ্রহে (পৃথিবীতে)। তারা এই নতুন গ্রহের দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যায় যে এখানেও প্রাণ আছে, আছে অগণিত গাছ, প্রাণী, আর পাখি। তারা প্রথম আশ্রয় নেয় বরফে ঢাকা এক পর্বতের শীর্ষে, শরীর ভীষণ ক্লান্ত হলেও তারা অবাক হয়ে বুঝতে পারে—এই গ্রহে তাদের শ্বাস নিতে কোনো বাধা নেই।
শিও বুঝতে পারে যে এই গ্রহ সেই গ্রহ যার কথা তারা ছোটো বেলাতে শুনেছে। শুনেছিল জেনোর কাছে যে আরো একটি গ্রহে প্রাণ রয়েছে, আর সেই গ্রহ খুব বেশি দূর নয়, পাশেই কোথাও আছে যার বর্ণ নীলাভ। সে বুঝতে পারে যে তারা খুব বেশি দূরে নয়, পাশের গ্যালাক্সিতেই রয়েছে। কিন্তু আর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই।

Reviews
There are no reviews yet.